শিরোনাম :
বিএনপি পন্থী কৃষিবিদ সংগঠনে আওয়ামী সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসনের তৎপরতা! পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতের কোম্পানি বাড়াতে সেমিনার করবে বিজিএমইএ ৫০ কোটি টাকা কর ফাঁকি : সাঈদ খোকন ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব জব্দ বিকাশ থেকে ব্যাংক, ব্যাংক থেকে রকেট: এক প্ল্যাটফর্মে হবে সব লেনদেন জবিতে এনআরবিসি ব্যাংকের আর্থিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাংলাদেশ আরটিজিএস ব্যবস্থায় নতুন লেনদেন সূচি ঘোষণা বাংলাদেশ রপ্তানি এলসি কমেছে ১১.১১%, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাসের প্রভাব আগোরা লিমিটেড অ্যাকাউন্টস সুপারভাইজার পদে নিয়োগ, আবেদন শেষ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ইসলামী ব্যাংক শুদ্ধি অভিযান: ৪০০ কর্মী চাকরি হারালেন, দক্ষতা যাচাইয়ের অংশ চট্টগ্রাম বন্দর ট্যারিফ বৃদ্ধি: ১৪ অক্টোবর থেকে নতুন হারে কনটেইনার হ্যান্ডলিং খরচ বৃদ্ধি

বিষণ্ন বুড়িগঙ্গা বিপন্ন ঢাকা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪
  • ১৫৪ পড়া হয়েছে

রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স ৪০০ বছর পেরিয়েছে বেশ অনেক দিন হলো। এ সময় ঢাকাকে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ঢাকাকে রাজধানী শহর হিসেবে নির্বাচনের পেছনে বুড়িগঙ্গা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। শুরু থেকে মুঘল শাসনের সময় থেকে ঢাকার চারদিকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গার অর্থনৈতিক, জলযান চলাচল এবং নিরাপত্তার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এসেছে। বুড়িগঙ্গাকে ব্যবহার করেই ঢাকার ইতিহাস, জীবনযাত্রা, শিল্প এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে। অথচ শত শত বছর ধরে সেই বুড়িগঙ্গাকে যথেচ্ছ নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে। রাজধানী ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়নের কারণে এককালের সম্ভাবনাময় বুড়িগঙ্গা হারিয়েছে তার ঐতিহ্য। বুড়িগঙ্গাকে অকার্যকর করে তোলা শুরু হয়েছে সেই ১৯১৭ সাল থেকে। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে বুড়িগঙ্গাকে পুনরুদ্ধারের নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও কার্যত তা সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু বুড়িগঙ্গার পানির ক্রমাগত দূষণের ফলে বুড়িগঙ্গার ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষের জীবনধারণকেই পাল্টে দিয়েছে। আজ রাজধানী চার মিলিয়ন মানুষ বুড়িগঙ্গা দূষণের নির্মম শিকার। এ ধরনের দূষণ বুড়িগঙ্গায় চলাচলকারী নৌযানের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে বাধার সৃষ্টি করেছে। ফলে নৌযানের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক, সদরঘাটের হকারদের জীবন ও জীবিকায় ওপর পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এমনকি মৎস্যজীবী এবং ধোপা সম্প্রদায়ের পেশায় এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ঢাকা নগরীর কঠিন বর্জ্য, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, নৌযানের ব্যবহৃত তেলের মিশ্রণে বুড়িগঙ্গার পানি আজ কার্যত ব্যবহার অযোগ্য। বিভিন্ন সময়ে বুড়িগঙ্গার পানি পরীক্ষা করে তাতে পানির বিশেষত্ব এবং গুণাবলি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের নিয়মনীতিকে অগ্রাহ্য করে নৌযান থেকে বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গায়। বিআইটিএ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে নদী খননকালে বিপুল পরিমাণ পলিথিন বর্জ্য পাওয়া যায় বুড়িগঙ্গার তলদেশে। এমনকি নদীপাড়ের দালানকোঠার ভাঙা ইট, পাথর, জমাটবাঁধা সিমেন্টের মতো ভারী বস্তুরও সন্ধান মেলে। তথ্য বলছে, রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন ৪ হাজার ৫০০ টন কঠিন বর্জ্য এবং ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলছে। এ ছাড়া যান্ত্রিক জলযানের পোড়া তেল, মবিলে পূর্ণ রয়েছে বুড়িগঙ্গার পানি। বুড়িগঙ্গাপাড়ের হাটবাজারের পচনশীল পদার্থের ভারে দূষিত নদীর পানি। এমনকি বিষাক্ত হাসপাতাল বর্জ্যও রয়েছে বুড়িগঙ্গায় পানিতে। এক তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালের ‘এনভায়রনমেন্ট কলজারভেশন রুল’ না মেনে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি টেক্সটাইল, মেটাল, কেমিক্যাল, রাবার, সিমেন্ট, চামড়া, সার এবং ওষুধ শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি দূষিত তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা-তুরাগের পানিতে দূষণের প্রবাহে লক্ষ করা যায়, গাজীপুর এলাকার শিল্পবর্জ্য প্রথমে তুরাগে এসে পড়ে এবং ঢাকায় পৌঁছে তা টঙ্গী খালে মিলিত হয়ে সাভার ও টঙ্গীর বর্জ্য সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা নদীদূষণের উৎস হিসেবে ঢাকা এবং এর আশপাশের যেসব স্থানের শিল্পবর্জ্যকে চিহ্নিত করেন তা হলো—ঢাকা এক্সপোর্টিং জোন, টঙ্গী, তেজগাঁও, হাজারীবাগ, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর এবং ঘোড়াশাল। এসব এলাকার বেশিরভাগ শিল্পকারখানার নিজস্ব কোনো শোধনাগার নেই। টেক্সটাইল ডাইং, প্রিন্টিং, ওয়াশিং এবং ওষুধ শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য নদীতে এসে মিলিত হয়। টেক্সটাইল শিল্পকারখানা বছরে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন টন বর্জ্য এবং ০.৫ মিলিয়ন টন স্লাজ অপসারণ করে। তুরাগ-টঙ্গী খালের অভ্যন্তরমুখী প্রবাহ কর্ণতলী নদীতে মিলিত হয়ে বুড়িগঙ্গার প্রবাহ হিসেবে পরিচিত। তথ্যমতে, প্রায় ১২ হাজার ঘনমিটার অশোধিত তরল বর্জ্য প্রতিদিন তেজগাঁও এবং বাড্ডা লেক থেকে রাজধানীর জলপ্রবাহে নির্গত হয়। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গার পানি প্রবাহে ট্যানারি বর্জ্যই দূষণের প্রধান উৎস।

পলিথিন দূষণ থেকে অদ্যাবধি বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বুড়িগঙ্গার যে অংশ লোকবসতির কাছাকাছি সেখানকার তলদেশে উচ্চ গভীরতার পলিথিন জমে থাকায় পানি চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়ে দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে বাবুবাজার, জিঞ্জিরা, কালীগঞ্জ, পোস্তগোলা, শ্যামপুরের অসংখ্য ছোটখাটো কলকারখানা রয়েছে। এসব কারখানা, জাহাজ মেরামত শিল্প, রং ছাপা কারখানা, ধোলাই কারখানা থেকে অশোধিত তরল বর্জ্য প্রতিনিয়ত বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে। বিশেষ করে, হাসপাতাল বর্জ্য, ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিত্যক্ত, পোড়া তেল মবিল এবং প্লাস্টিক বোতলের মতো বর্জ্য নদীর পানি দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে চলছে। ঢাকা সিটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, দূষণের মাত্রাও বেড়ে গিয়ে জনস্বাস্থ্য পড়ছে হুমকির মুখে। এক সময়ের পানযোগ্য এই পানি আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো কাজেই ব্যবহারযোগ্য নয়। কালো বর্ণের ঘোলা পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে না পারায় মাছসহ যে কোনো জলজ জীব বা উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। কেননা সূর্যের কিরণবিহীন পানিতে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সংঘটিত হতে পারে না। এমনকি অক্সিজেননির্ভর শ্যাওলাও অস্বিত্বহীন হয়ে পড়ে।

বুড়িগঙ্গার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে এর পানির দূষণ রোধ করতে হবে। নদীপাড়ের দূষণের উৎসসমূহকে চিহ্নিত করে নদীতে এর নির্গমন বন্ধ করতে হবে। বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত বাসগৃহের স্যুয়ারেজ অপসারণের স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তা নিকটস্থ ভূপৃষ্ঠের এবং ভূগর্ভের পানিকে দূষিত করতে না পারে। নদীর আশপাশের হাটবাজার থেকে আসা আবর্জনা, কীটনাশক থেকে নদীকে রক্ষা করতে হবে। বুড়িগঙ্গা পাড়ের রাসায়নিক কারখানার তরল বর্জ্যের সঠিক বিশোধন এবং নিরাপদ অপসারণ ছাড়া নদীর পানির দূষণ রোধ সম্ভব নয়। নদীকে তৈলজাত দূষক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গায় যন্ত্রচালিত নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। নদীর আশপাশের রাস্তা ও পার্কিং স্থলে ফিল্টার পন্ড নির্মাণ করে তেল ও আবর্জনামিশ্রিত পানিকে নদীতে নির্গমন রোধ করা যেতে পারে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে দৃষ্টিনন্দন গাছপালা লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীর পানি দূষণে সহায়তা লাভ করা সম্ভব। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে, নদীর পানিকে নির্মল রাখতে জনগণকে দায়িত্ব সচেতন করে তুলতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রকৌশলী

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2024