মোস্তফা কামাল: সম্প্রতি এনবিআর কর্তৃক ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি ৫০ লাখ টাকা অতিক্রম করলেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হবে, যেটা আগে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত চার শতাংশ ছিল। দেশের অন্যান্য সেক্টরে এর প্রভাব কেমন পড়বে, সেটা সম্পর্কে জানি না। তবে ওয়েব হোস্টিং ও আইটি সেক্টরে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, সেটা অনুমেয়।
উদাহরণস্বরূপ, দেশীয় ওয়েবহোস্টিং পরিষেবাদাতা কোম্পানিগুলো তাদের পরিষেবার সঙ্গে খুবই সীমিত পরিমাণ মার্জিন রেখে সেটাকে বিক্রি করে। আর তাদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হচ্ছে আন্তর্জাতিক, অর্থাৎ একজন ওয়েব হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার ও ডোমেইন নেম সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে আমাকে প্রতিযোগিতা করতে হয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যেমন নেমচিপ, গোডাড্ডি ও হোস্টিঙ্গারের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এছাড়া এ সেক্টরে দেশীয় ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই শিক্ষার্থী।
এখানে হয়তো অনেকে প্রশ্ন রাখতে পারেন, আমার ব্যবসার ক্ষেত্র বাংলাদেশ, কিন্তু আমাকে কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এর কারণ হচ্ছে দেশীয় ওয়েব হোস্টিং সেবাগ্রহীতাদের একটি বড় অংশই সেবাদাতা হিসেবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পছন্দ করে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ দেশের সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে উচ্চমানের নীতিসহায়তা পেয়ে থাকে বলে তারা গ্রাহকদের কম খরচে মানসম্পন্ন সেবা দিতে সক্ষম। এ ধরনের নীতিসহায়তা পেলে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
ডোমেইন নেম সার্ভিস ও ওয়েবহোস্টিং সার্ভিস একটি ক্রস-বর্ডার সার্ভিস, যে কেউ চাইলে যেকোনো সময়ে বিনা বাধায় যেকোনো দেশের কোম্পানি থেকে এই সার্ভিস গ্রহণ করতে পারে। এখানে যদি আমার প্রতিষ্ঠান অন্যন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম মুল্যে সেবা প্রদান না করতে পারে, তাহলে গ্রাহক কেন আমার প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করবে? এমনকি, যদি আমরা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সমমূল্যেও সেবা অফার করি, তাহলে তারা আমাদের বাদ দিয়ে বিদেশি কোম্পানি থেকেই সেবা গ্রহণ করবে। কারণ আজও আমাদের দেশের গ্রাহকদের একটি বড় অংশ যেকোনো বিদেশি সামগ্রী ব্যবহারে বেশি পরিতৃপ্তি পেয়ে থাকে।
এর আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে দেশীয় সেবা প্রদানকারীদের প্রতি আস্থার অভাব। কারণ এই সেক্টরে প্রচুর ফটকাবাজ রয়েছে, যারা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে রিসেলার গ্রহন করে কয়েক দিন বিক্রি করে এরপর হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত দেশে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ওয়েব হোস্টিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০টির মতো। আমরা গত বছরের মে মাসের দিকে সবাই মিলে একটা জরিপ চালিয়েছিলাম, যাতে বেসিসের মেম্বারশিপ আটটি ওয়েব হোস্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার পেয়েছিলাম, প্রতিটি কোম্পানির বার্ষিক গড় বিক্রি সাড়ে তিন কোটির মধ্যে।
সেই হিসেবে ওয়েব হোস্টিং ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক টার্নওভার মাত্র ২৮ কোটি টাকা। বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইট তৈরি হয় ১৯৯১ সালে। ১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই সেক্টরের পরিধি ৩০ কোটি টাকারও কম। অথচ এর পরে তৈরি হওয়া অনেক সেক্টর পাওয়া যাবে, যাদের পরিধি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যদি এই সেক্টরও উপযুক্ত সাপোর্ট ও ভালো পরিবেশ পেত, তাহলে এটিও হয়তো আজ ২৮ কোটি থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারত।
এ অবস্থায় এটার ওপরেও যদি ১৫ শতাংশ ভ্যাট চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে এটির বেড়ে ওঠার আগেই এর গলা টিপে এটাকে মেরে ফেলা। আমরা মুষ্টিমেয় ওয়েব হোস্টিং সেবাদাতা কোম্পানি যারা আছি, আমরা কখনও সরকারের কাছে কোনো অনুদান চাইনি, কখনও কোনো প্রণোদনা চাইনি, আমরা সব সময় শুধু বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ চেয়েছি, যাতে এটি হাজার কোটি টাকার একটি ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠে। ওয়েব হোস্টিংগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মতো নিজ দেশের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে উচ্চমানের সেবা পায়। অন্যদিকে আমাদের দেশের ওয়েব হোস্টিং প্রতিষ্ঠানগুলো পদে পদে প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে। ওয়েব হোস্টিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়, প্রণোদনা নয়, ব্যবসার সহায়ক পরিবেশ চায়।
আগে উল্লেখ করেছি, যদি আমরা বিদেশি কোম্পানির সমমূল্যেও সেবা অফার করি, তাহলেও দেশীয় সেবাগ্রহীতারা আমাদের বাদ দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকেই সেবা গ্রহণ করবে। যদি এখন হঠাৎ বাড়তি ভ্যাট আরোপ করা হয়, তাহলে আমাদেরও বাধ্য হয়ে ওই পরিমাণে মূল্যবৃদ্ধি করতে হবে। তখন গ্রাহকরা কেন বর্ধিত মূল্যে আমাদের থেকে সেবা গ্রহণ করবে, যেহেতু একটা ডুয়েল কারেন্সি কার্ড হলেই তারা কম মূল্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকেই সেবা গ্রহণ করতে পারছে? এছাড়া দেশের ওয়েবসাইট গ্রহীতাদের একটি বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করে, যার ফলে দেশের টাকার একটি অংশ প্রতিবছর বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমরা দেশীয় কোম্পানিগুলো কিছুটা হলেও দেশের টাকা দেশে রেখে দিতে পারছি। যদি আমাদের পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করা হয়, আমরা চেষ্টা করে যাব যেন এই সেবার জন্য দেশীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না হতে হয় এবং এ ক্ষেত্র থেকে দেশের যে টাকাটা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তার পুরোটাই যেন দেশেই থেকে যায়।
এছাড়া কিছু বিদেশি গ্রাহক এ মুহূর্তে আমাদের কাছ থেকে পরিষেবা নিচ্ছে, তার মাধ্যমে অল্প হলেও বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশে আসছে। আমরা সুযোগ চাই যাতে এই সেক্টরের মাধ্যমেও প্রবাসী আয়ের মতো অধিক হারে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসতে পারি।
ওয়েব হোস্টিং প্রতিষ্ঠানের দিকে লক্ষ না করে গণহারে ভ্যাট-ট্যাক্স চাপিয়ে দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয় যা হতে পারে—এক. উদ্যোক্তা ও কর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজতে হবে; দুই. বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে; তিন. গায়ের জোর থাকলে অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন বেছে নিতে হবে; চার. কোনোটাই না করতে পারলে আত্মহত্যা ব্যতিরেকে গত্যন্তর নেই। এমন অবস্থা হয়তো কাম্য নয়, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’ কিন্তু বেঁচে থাকা যে দুষ্কর! যেসব বাস্তবতা সামনে আসে—এক. বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে চাকরি খুঁজলে এ খাতের এত জনগোষ্ঠীকে কে দেবে যথাযোগ্য চাকরি? বরং এসব প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করছেন তারা চাকরি হারাবেন; দুই. জীবিকা নির্বাহে বিদেশে পাড়ি জমানোও একটা সহজ ব্যাপার নয়, বা পাড়ি জমাতে পারলেও সফল হওয়া সর্বদা সহজ নয়। আমরা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের কান্না দেখতে পাচ্ছি; তিন. এই সেক্টরের সবাই শিক্ষিত। তাদের পক্ষে ছিনতাই, রাহাজানি ও চাঁদাবাজির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া সম্ভব নয়; চার. আত্মহত্যা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একটি নিকৃষ্ট কর্ম। এতে আমাদের ওপর নির্ভরশীল যারা তাদেরও একই পন্থা বেছে নিতে হবে।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক তথা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই উপরিউক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনাপূর্বক ওয়েব হোস্টিং ইন্ডাস্ট্রিকে বেড়ে ওঠার বিশেষ সুযোগ দানে এটিকে যাবতীয় ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতামুক্ত রাখার জন্য। এটি করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।