পল্লির সংস্কৃতি ও জীবনধারা আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে এ দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানুষকে। সহজসরল জীবনবিলাসী মানুষ এ দেশবাসী। বাংলার প্রকৃতি দুলালী নদী মেখলা এ দেশ। পল্লির জীবনযাত্রা সহজ বলে পল্লির মানুষ আয়েশী। কাব্য ও শিল্পচর্চা এদেশে প্রাচীনকাল থেকেই দেখা যায়। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের এই মমতাময়ী বাংলাদেশে সাহিত্যে গীতি প্রবণতা ও সংগীতের ভাব বেশ পরিলক্ষিত হয়।
পল্লির ভাটিয়ালী, মারফতি, বাউল, মুর্শিদী প্রভৃতি গান পল্লির কথাই বলে। সাধারণ মানুষ ঘরের দরজায় বসে মনের সুখে এ গান শুনত। যে সংগীতের ছিল না কোনো নির্দিষ্ট সুর ও লয়। আজ সেটা পল্লি হারাতে বসেছে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে। পল্লির আরেক অবিস্মরণীয় দিক হলো কবিগান, যাত্রা, থিয়েটার, জারিগান, সারিগান, পালাকীর্তন, গাজীর গান ও আঞ্চলিক গান ইত্যাদি।
অনুষ্ঠানমূলক সংস্কৃতির কথা আলোচনা করতে গেলে প্রথমে মনে পড়ে পল্লির কৃষকের গানের কথা। গরু লাঙ্গল টানছে আর কৃষক পেছন থেকে নানা আবেগের গান গেয়ে জমিতে চাষ দিচ্ছে। এতে কৃষকের দূর হয় ক্লান্তি, কাজের হয় অগ্রগতি। পল্লির আরেকটি আমেজ হলো ‘নবান্ন উৎসব’। পল্লির প্রায় ঘরে ঘরে বর্তমানে চলছে আনন্দের জোয়ার তথা নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে প্রতিদিন কৃষাণিরা তৈরি করছে নানা ধরনের মুখরোচক পিঠাপুলিসহ উপাদেয় সব খাবার। কৃষাণি কৃষককে সেই ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যা ধান রোপণের সময় কৃষক কৃষাণিকে বলেছিল। কৃষাণি পথ চেয়ে বসে থাকে কৃষকের সেই ওয়াদার লাল শাড়ির জন্য। নবান্ন উৎসবের মধ্যে আরও অনেক কিছু সংযোজিত হয়।
পল্লিতে সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠানাদির মধ্যে আছে মুসলমানদের প্রধান উৎসব ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধদের বৈশাখী পূর্ণিমা ইত্যাদি। ধর্মীয় দিক দিয়ে পল্লি অতীতে কোনো সময় পিছিয়ে ছিল না। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতো প্রতিটি গ্রামে গ্রামে। বর্তমানে পল্লি নানাভাবে সংস্কৃতিতে পিছিয়ে আছে। তাই পল্লির সংস্কৃতি আর নাগরিক সংস্কৃতির দৃশ্যপট পর্যালোচনায় গেলে আহত হতে হয়। নাগরিক সংস্কৃতি যেভাবে প্রসার লাভ করছে, সে অনুপাতে পল্লির সংস্কৃতি আগের চেয়ে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে।
গ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বিদ্যালয়ে নাটক করার মানসে জোর প্রস্তুতি শুরু হয়। যিনি নাটক পরিচালনা করবেন তিনি খুবই আমোদী লোক। নাটকের নাম ‘আম চোর’। শেষ দৃশ্যে রনজন আম চোরকে যখন মঞ্চে আনা হলো, তা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এলাকার লোকেরা পর্যন্ত রনজনের শাস্তিমূলক অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছে। এখন এ ধরনের নাটকের স্মৃতিচিহ্ন নেই কোথাও।
পল্লিতে এখন দেখা যায় চায়ের দোকানে টিভি চলছে। সকলে উপভোগ করছে প্রচারিত নানা সিরিয়াল। বিদ্যালয়ভিক্তিক তেমন কিছু করা হয় না। শিক্ষকরা উদ্যোগী না হলে যা হওয়ার কথা তা-ই হচ্ছে। শীত মৌসুমে উপভোগ্য খেলাধুলা ভলিবল, ব্যাটমিন্টন, দাড়িয়াবান্ধা, গোলাছুট, বৌচি, কানামাছি, লুকোচুরি, লাঠিখেলা ইত্যাদি। এখন উল্লিখিত খেলাগুলো প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।
স্বাধীন জাতি হিসেবে এই শোচনীয় অবস্থার পরিবর্তন করে গ্রামগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য আমার আপনার সকলের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলে বিজ্ঞ মহলের অভিমত। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শ্রমশীলতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। নানা প্রকার ক্রীড়া, কৌতুক ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা করা গেলে চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখে দেখে বাজে চিন্তাধারা থেকে অনেকে বেরিয়ে আসতে পারে। প্রতিটি গ্রামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করা যেতে পারে।
আমাদের দেশে এমন একদিন ছিল যেদিন গ্রামগুলো ছিল বিশেষ সমৃদ্ধ। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম- জীবনে সুখ ছিল, সম্প্রীতি ছিল। গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ও গোয়ালভরা গরুর কথা একেবারে গালগল্প বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চাষি, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতী প্রভৃতি কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থল ছিল গ্রাম। গ্রামের মানুষের সব প্রয়োজনের জিনিস তারাই জোগান দিতো। পল্লির মানুষের মানবিক শিক্ষার আয়োজনও ছিল সুবিস্তৃত। জারি, সারি, ভাটিয়ালি, কবিগান, কীর্তন, কথকতা প্রভৃতি কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ সবের মধ্য দিয়ে গ্রামের মানুষ জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতো, নীতি ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হতো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ গ্রামের মানুষ যেটুকুই লাভ করুক না কেনো, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের মধ্যেই ছিল প্রচুর সুযোগ।
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য বা অতীত সবটাই হয়তো ফিরিয়ে আনা যাবে না। গ্রাম এবং গ্রামের সংস্কৃতি অবহেলা করে আমরা কিছুতেই জাতিগত সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারব না, সে কথাও আমাদের মনে রাখা উচিত। গ্রামের উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এখনো সিংহভাগ মানুষ গ্রামেই বসবাস করে। বিপুল সংখ্যক মানুষকে দীন, অসহায় ও অন্ধকারে রেখে শতকরা দশজন মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতির চিন্তা করা সমীচীন নয় বলে সুশীল সমাজের ধারণা।
জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও কুটিরশিল্পের উন্নয়ন এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটিয়ে মানুষের বাসোপযোগী করে গড়ে তোলা ছাড়া জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতি অসম্ভব। জনসংখ্যা একটি সমস্যা। এ সমস্যা যে গ্রামের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, সে সম্পর্কে সক্রিয় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
পল্লি সংস্কার এখন এমন একটা সমস্যায় দাঁড়িয়েছে যার সহজ মীমাংসা কেউ করতে পারছে না। অনেক দিনের নানা সমস্যায় জর্জরিত পল্লির সংস্কৃতি বিষয়ে কেউ কিছু ভাবছে না বলেও মনে হচ্ছে। ‘শিকড়ের’ কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে হারিয়ে ফেলছি পল্লির ঐতিহ্য তথা সেই পুরনো দিনের স্মৃতি জাগানিয়া দিনগুলো। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ঘটাতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সক্রিয় হতে হবে। কারণ, সাধারণ জনগণ এতো কিছু নিয়ে ভাবে না। আসুন, পল্লির সংস্কৃতি বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও নিজেদের আরও সক্রিয় করে তুলি।
লেখক : সাংবাদিক