মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এই জীবের আছে স্বতন্ত্র বিচার, উদ্ভাবনী, ইচ্ছা শক্তি ও সুষ্ঠু বিবেক। বিবেকের দ্বারাই একজন মানুষ শুদ্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে সবচেয়ে সেরা জিনিসটিই বাছাই করে। কিন্তু পৃথিবীর কালের আবর্তনে মানুষের বিবেকহীন কার্মকাÐ একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। আসলেই কি আমরা সৃষ্টির সেরা জীব? বিশেষ করে নিজের ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে মানুষ কতো কিছুই না করে। যেমন— খুন, গুম, মানুষিক ও শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি। এমনকি জনসম্মুখে মানবতার ফেরিওয়ালা এবং পর্দার আড়ালে পৈশাচিক রূপও দেখা যায়। এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। শুধু নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্যই একই মানুষের বিভিন্ন রূপ।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। যেটি মূলত এক অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাÐের মাধ্যমে এর সূত্রপাত। ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন এই এক হত্যাকাÐকে কেন্দ্র করে পৃথিবীবাসী এক নারকীয় তাÐবের সাক্ষী হয়। এর মাধ্যমে মানুষের পৈশাচিক রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মানুষ হত্যার এই নির্মমতাকে বন্ধ করতে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা ঐক্য ও শান্তির প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি প্যারিসে গঠন করে লীগ অব নেশনস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা না কাঁটতেই জার্মানির হিটলার ও তার নাৎসি দলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও আগ্ৰাসী বৈদেশিক নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইন্ধন জোগায়। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দীর্ঘ এই ৬ বছরের যুদ্ধ অন্য সকল যুদ্ধকে ছাড়িয়ে গেছে। এই যুদ্ধে ভয়াবহ থেকে মানবজাতিকে রক্ষায় নতুন করে আবারো উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে শান্তিরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও বিশ্বব্যাপী উন্নয়নে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৮০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু আমরা কি আজও শান্তি ফিরে পেয়েছি? যেখানে প্রায় প্রত্যেক দেশেই নিজের স্বার্থে বিবেকহীন কাজ করছে।
যে সংগঠন শান্তিরক্ষা, নিরাপত্তা, খাদ্যসহ মানব চাহিদা নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর, আজ তার সেই লক্ষ্যর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? এখন কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আফ্রিকার দুর্বিষহ অবস্থার দিকে তাকালে বুঝা যায় যে, মানবসভ্যতা আজ কোথায় আছে। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার পরেও বিশ্ব প্রতিদিন কোনো না কোনো মানব সৃষ্ট সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মহা জোটও নিজেদের মধ্যকার সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। বিশেষ করে জাতিসংঘের স্থায়ী ৫ সদস্য রাষ্ট্রের স্বার্থ ও আদর্শিক মতপার্থক্য থাকার কারণে। যে সংগঠনটির সবচেয়ে বড় অগণতান্ত্রিক উপাদান হলো— স্থায়ী সদস্যদ রাষ্ট্রের ভেটো প্রদান ক্ষমতা। যদি সংস্থাটির প্রকৃত শান্তি বজায়ের উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে আজ দশকের পর দশক ধরে কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আফ্রিকাসহ নানা প্রান্তের এরূপ দুর্বিষহ অবস্থা বজায় থাকত না। বিষয়টি কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে আলোচনা করা যাক।
ইসরায়েল–ফিলিস্তিন ইস্যু হলো ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট যার সমাধান তো হয়নি; বরং তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ইস্যুতে দুপক্ষই সমানভাবে অভিযোগ দিয়ে আসছে। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর থেকে ইসরায়েল যে নারকীয় তাÐব চালিয়ে আসছে তাতে পশ্চিমা বিশ্ব একতরফা দেশটিকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে আসছে। হামাস নির্মূলের নামে সাধারণ মানুষদের যেভাবে হত্যা, ধর্ষণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে, তাতে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র দেশটির পাশে নেই। এমনকি আরব বিশ্ব আজ নিশ্চুপ। সংবাদ তথ্য মতে, হামাসের ইসরায়েলে হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২০০ জন। বিপরীতে ইসরায়েলের গাজা হামলায় মৃতের সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি। গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, আহতদের সংখ্যা ৯৫ হাজার। জাতিসংঘের ধারণা, ধ্বংসস্তূপ সরাতে ১৫ বছর লাগবে, আর এ কাজে অর্থ খরচ হবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি মার্কিন ডলার। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ রয়েছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডবিøউএ) প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেন, ‘স্কুল ও হাসপাতালের ওপর হামলা এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব যেন এই পরিস্থিতির প্রতি উদাসীন না হয়। প্রতিটি যুদ্ধের নিয়ম থাকে, কিন্তু গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় সব নিয়ম ভাঙা হয়েছে।’ অর্থাৎ, দেশটি যুদ্ধের সকল নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। এতদসত্তে¡ও, জাতিসংঘে বারবার যুদ্ধ বন্ধ ও মানবিক সহায়তার প্রস্তাব উঠলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রদান এবং বিপরীতে ইসরায়েলকে সকল ধরনের সহায়তা প্রদান করছে।
আবার রোহিঙ্গা ইস্যু বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট সংকটের একটি। এই সমস্যা দিন দিন বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে ওঠছে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গারা জান্তা বাহিনীর কাছ থেকে নিজেদের রক্ষার্থে বাংলাদেশে পাড়ি জমায়। সংবাদ তথ্য মতে, বর্তমানে এই শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি। এর আগেও ১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে বাস করতে শুরু করে। এরমধ্যে ৮ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে। সরকার অবশ্য বলছে, নতুন করে আর একজন রোহিঙ্গাকেও আশ্রয় দেয়ার মতো অবস্থায় নেই বাংলাদেশের। আবার, মায়ানমারের সরকারি ও আরাকান আর্মির মধ্যকার যুদ্ধ এই ইস্যুটাকে আরো অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়ে গেছে। মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘আরাকান আর্মি যদি রাখাইন অঞ্চলের একটি বড় অংশ দখলে নিয়েও আসে তাহলে তারা বলবে না যে এখন রোহিঙ্গারা চলে আসুক। বরং মিয়ানমার জান্তা বলবে যে এখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে আসার পরিবেশ নেই।’ অন্যদিকে, জাতিসংঘে বারবার রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপিত হলেও তাতে কার্যকরী কোনো ভ‚মিকা নেই। কারণ, চীন আর প্রতিবেশী ভারতও মিয়ানমারের সাথে তাদের ভ‚রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকায় রোহিঙ্গাদের চড়ম মানবিক বিপর্যয়ের পরও তারা বাংলাদেশের পাশে নেই। শুধু মুখেই আশ্বাস দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।
আর কাশ্মীর ও উইঘুরের মুসলমানদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। অন্যদিকে, আফ্রিকা প্রায় সকল দেশেই দুর্বিষহ অবস্থা। যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে থাকার নূন্যতম চাহিদাও পূরণ করতে পারছেনা। প্রাকৃতিক সম্পদ ভরপুর হলেও আজ সেখানে হত্যা, লুটতরাজ ইত্যাদি বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়াও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের আধিপত্য তো রয়েছেই।
আবার, বিশ্বে ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র রয়েছে যার মধ্যে অনেকগুলো রাষ্ট্র রাজতান্ত্রিক। এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে গণতন্ত্রের বিপরীতমুখী অবস্থান। এসব রাষ্ট্র আবার পশ্চিমা প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ এবং তাদের অনুগত। যদিও মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় ওআইসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবুও এটির বর্তমান কার্যক্রম কাগজে–কলমে বা মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একতাবদ্ধ হয়, তাহলে তা পরোক্ষভাবে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধাচরণ করা। আর তারা কখনোই চায় পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে। আজ পর্যন্ত মুসলমানদের শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো স্থায়ী কার্যকরী পদক্ষেপ সংগঠনটি নিতে পারেনি। এর জলন্ত উদাহরণ হলো— মধ্যপ্রাচ্য, রোহিঙ্গা, কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি। যুগের পর যুগ ধরে এই সমস্যা সমাধানে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো পশ্চিমাদের রক্তচক্ষুর ভয়ে নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে নেই। তাই, মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজস্ব স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে একতাবদ্ধ হতে হবে।
অতএব, যুগে যুগে বিশেষ শক্তিশালী গোষ্ঠীর তথাকথিত স্বার্থ যেমন— ভ‚রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, অর্থনৈতিক সুবিধা, জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণ বৈষম্য, ধর্মীয় পার্থক্য ইত্যাদি কারণে মানবতার চড়ম বিপর্যয় ঘটেছে। আমরা যে সকল স্বার্থের উপরে রক্তে–মাংসে গড়া একজন মানুষ তার পরিচয়টাও ভুলে যাই। নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারই সবার প্রথম চাওয়া। ফলে মানুষকে দেখা হয় পশুর চেয়েও অধমের চোখে। আর লোপ আমাদের পায় স্বাধীন বিবেক। দেশের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষিত উচ্চ শ্রেণির নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ এসব প্রত্যাশা কখনোই করে না। তাই, সাম্য, স¤প্রতি ও একতার পৃথিবীত গড়তে আমাদের অবশ্যই সকল মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের কথা বিবেচনা করতে হবে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া