আগামী বছরে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফেরাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (১১ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গভর্নর। সেখানে তিনি বলেন, “বর্তমানে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৮-৯ শতাংশে রয়েছে, যা পূর্বে ছিল ১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত। আমরা ধাপে ধাপে এই হার আরও কমিয়ে আনতে কাজ করছি। আগামী বছর মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে।”
গভর্নর মনসুর বলেন, “দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের সমন্বিত নীতিমালার বাস্তবায়ন ইতিমধ্যে সুফল দিতে শুরু করেছে।” তিনি জানান, ব্যালেন্স অব পেমেন্টে এখন ঘাটতি নেই, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, “রপ্তানি খাতে উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি আয় বর্তমানে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, যা বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।”
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, অর্থ পাচার প্রতিরোধ নিয়ে গভর্নর বলেন, “প্রথমবারের মতো সরকার বিদেশি ল ফার্ম নিয়োগ করেছে, যারা পাচার হওয়া অর্থের অবস্থান শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমে সহায়তা করছে।” এছাড়া কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথভাবে অ্যাসেট ফ্রিজ (সম্পদ জব্দ) করার প্রক্রিয়াও চলছে।
ড. মনসুর আরও জানান, “আলোচনার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে, যাতে আনুষ্ঠানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় অর্থ পুনরুদ্ধার করা যায়। এটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ অগ্রগতি অর্জন করেছে।”
গভর্নর বলেন, মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঋণখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতেও কাজ করছে। অনিয়মিত ঋণ কমিয়ে আনা, নন-পারফর্মিং লোন (NPL) হ্রাস এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অগ্রাধিকার।
এছাড়া, ডলারের বিনিময় হার ও সুদের হার নিয়ে সম্ভাব্য স্থিতিশীলতা আনার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান গভর্নর।
গভর্নরের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী বছরে দেশের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল এবং সুশাসিত কাঠামোর মধ্যে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত তিনটি বিষয়ে জোর দিচ্ছে—মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার রোধ এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভর্নরের এমন বক্তব্য সাধারণ জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং বিনিয়োগ ও বাজার স্থিতিশীলতায় সহায়ক হবে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন যথাযথ নীতিগত দৃঢ়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় থাকে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, “আমরা স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে অর্থনীতির কাঠামোকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু পরিসংখ্যানের উন্নয়ন নয়, বাস্তব জীবনেও যেন মানুষ এর সুফল পায়।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ, বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা—এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।