বাংলাদেশি পাসপোর্টে বহুদিন বাদে আবার ফিরে এলো সেই বহুল আলোচিত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নীলিমা আফরোজের স্বাক্ষর করা একটি চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত সকল দেশ ভ্রমণযোগ্য’ এই শর্ত পুনর্বহাল করতে হবে।

এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচির মাধ্যমে। গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং গণহত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বক্তারা দাবি জানান, বাংলাদেশের পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত পুনরায় যুক্ত করতে হবে।
এই সমাবেশে দেওয়া ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সরকার যেন স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয় যে, তারা কখনোই ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। একইসঙ্গে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের চুক্তি বা যোগাযোগ থাকলে তা অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানানো হয়। বক্তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানান—এই ইস্যুতে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখে স্পষ্ট অবস্থান নিন, যাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নীতিগত দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্তটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে সরকার এই শর্তটি বাদ দেয়, যদিও তখনও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবু এই পরিবর্তন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা দেখা দেয়। অনেকেই মনে করেন, শর্তটি বাতিল করে বাংলাদেশ একরকম নীরবতায় ইসরায়েলের প্রতি অবস্থান নরম করেছে।
তবে ‘মার্চ ফর গাজা’ আয়োজন এবং সেখানে প্রকাশিত জনমত এটাই স্পষ্ট করেছে—বাংলাদেশের জনগণ ও নাগরিক সমাজ এখনো ফিলিস্তিনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পাসপোর্টে পুনরায় ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শর্ত সংযোজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এই পদক্ষেপ শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। একদিকে এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে বিশ্ববাসীকেও জানিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ কখনোই আপস করবে না।
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, মানবাধিকার সংগঠন ও সাধারণ জনগণ। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশ করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে বড় বার্তা দিতে পারে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে।