গণহত্যার অভিযোগে সাবেক আইজিপি মামুন ও সেনা কর্মকর্তা জিয়াউলসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত গণহত্যার তিনটি পৃথক মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্তরা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে সকাল ১০টা নাগাদ তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এই মামলার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কারণ এতে ২০২৪ সালে দেশের ছাত্র আন্দোলনকে দমন করার জন্য সংঘটিত বর্বরতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং সেনা সদস্য, যারা ঐ সময় সরকারের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে পুলিশি ও সামরিক শক্তির ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে, গত ২০ নভেম্বর ও ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে একই মামলায় অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। তবে এই মামলায় নতুন করে আরো কয়েকজন সাবেক সরকারী কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মামুন ও জিয়াউল আহসানসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আগেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল, কিন্তু তারা পালিয়ে ছিলেন এবং এতদিন পর তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি উত্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত গুরুতর। বিশেষ করে, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী এমন ধরনের সহিংসতা চালিয়েছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আবার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, যিনি তার সামরিক কর্মজীবনে বহু বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন, গণহত্যার মত গুরুতর অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
এদিকে, ট্রাইব্যুনালের বিশেষ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, মামুনের নেতৃত্বে সংঘটিত পুলিশি কর্মকাণ্ড অত্যন্ত নিষ্ঠুর ছিল এবং এর ফলে বহু নিরপরাধ জীবন শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “এ ধরনের সহিংসতা কোনভাবেই আইনসম্মত ছিল না এবং এটি একটি ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ।” তাজুল ইসলাম আরো জানান যে, তদন্তে যে সকল প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি বিচারের জন্য প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মামলার বিচার দীর্ঘদিন ধরেই চলবে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসবে। মামলাটির বিচার মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি এবং দায়বদ্ধতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।
এছাড়াও, এটি একটি রাজনৈতিক সংকটের সময়কার ঘটনা, যখন সরকার ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে বিরোধী দলগুলোকে নিশানা করেছিল। এর ফলে বহু নিরীহ ছাত্র এবং নাগরিকের ওপর অত্যাচার ও সহিংসতা চালানো হয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একেবারে অমঙ্গলজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
বর্তমানে, এই মামলায় আরো ৫ জন সাবেক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব এবং বিচারপতিকে আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে তাদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমর্থনও দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী শুনানি আগামী ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। এই মামলার ফলাফল শুধু অভিযুক্তদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্যও এটি একটি বড় উদাহরণ হতে পারে, বিশেষত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এর স্থায়ী পদক্ষেপের গুরুত্ব উপলব্ধি করার দৃষ্টিকোণ থেকে।
উল্লেখযোগ্য যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এটি একাধিক বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তবে এটির কার্যক্রম কখনও কখনও রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিতর্কিত প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এজন্যও এই মামলাটি দেশের রাজনৈতিক এবং আইনগত ইতিহাসে বিশেষভাবে চর্চিত হবে।