ফিলিস্তিন—যেখানে শিশুরা বড় হয় ধ্বংসস্তূপের মাঝে, যুবকেরা বেড়ে ওঠে গোলাবারুদের ছায়ায়, আর মানুষ জানে না তাদের আগামীকাল আদৌ আসবে কিনা। এই ভূখণ্ডে জীবনের সংজ্ঞা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন। এখানে কৈশোর মানেই যুদ্ধ শেখা, যৌবন মানেই প্রতিরোধ আর স্বপ্ন মানেই—শহীদ হওয়া।
গাজা, নাবলুস, হেবরন কিংবা জেনিন—ফিলিস্তিনের প্রতিটি শহরেই আজ একটিই চিত্র: তরুণ মুখ, হাতে পাথর বা অস্ত্র, চোখে নির্ভীক দৃষ্টি। এই তরুণদের কাছে জীবন মানে যুদ্ধ, আর মৃত্যু মানে বীরত্ব। তাদের মধ্যে অনেকেই মনে করে, বন্দুকের নলের মাঝেই নিহিত রয়েছে মুক্তি, শহীদ হওয়ার মধ্যেই রয়েছে জান্নাতের রাস্তা।
শৈশব থেকেই তারা দেখে, কীভাবে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী একে একে হারিয়ে যাচ্ছে গুলির শব্দে। স্কুলের ব্যাগের পাশে থাকে চোখের জল আর প্রতিবাদ। যে বয়সে অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে থাকে, সে বয়সেই ফিলিস্তিনি যুবকেরা মাটির নিচে গোপন টানেলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
ফিলিস্তিনিদের বিশ্বাসে শহীদ হওয়া শুধু মর্যাদার নয়, চিরশান্তির পথও বটে। মসজিদে, শিক্ষাকেন্দ্রে, এমনকি ঘরের ভেতরেও সন্তানদের শেখানো হয়—জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ফরজ, আর প্রতিরোধই ইবাদত। এই বিশ্বাস, দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি মিলেই তৈরি করেছে এমন এক মানসিকতা, যেখানে মৃত্যু ভয় নয়—লক্ষ্য।
তরুণেরা যখন অস্ত্র তোলে, তারা জানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি কতটা সুসজ্জিত, কতটা ক্ষমতাবান। তবুও তারা পিছু হটে না, কারণ তারা জানে, বিশ্ব হয়তো কখনোই তাদের পক্ষে দাঁড়াবে না। আন্তর্জাতিক মঞ্চের দ্বিচারিতা, নীরবতা, আর অসহায়ত্ব দেখে তাদের মনে জন্ম নেয় হতাশা, আর সেই হতাশা ঠেলে দেয় চরম পথের দিকে।
ফিলিস্তিনের এই তরুণদের কেউ হতে পারতো চিকিৎসক, কেউ কবি, কেউ হয়তো বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ। কিন্তু অবরোধ, যুদ্ধ আর নিপীড়ন তাদের সামনে রেখেছে শুধুই অস্ত্র, আগুন আর রক্তের পথ।
তবুও কিছু তরুণ এখনও কলম ধরে, ক্যামেরা তোলে, গান লেখে। তারা বলে, “আমরা মরবো না, আমরা লিখে যাবো।” এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ—একদিকে অস্ত্র, অন্যদিকে আশার হাতছানি।
ফিলিস্তিনের যুবকেরা যখন বন্দুক তুলে নেয়, তা নিছক সহিংসতা নয়—তা একটি চরম পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া। এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাদের মুখে হাসির বদলে রেখে গেছে প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা। তারা জানে, হয়তো জান্নাত তাদের কাছে একমাত্র মুক্তির পথ।
এই গল্পটি কেবল এক অঞ্চল বা এক ধর্মের নয়, এটি মানবতার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘকালীন ক্রন্দনের নাম—যা শুনতে চায় না বিশ্বের অনেকেই।