রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে, জনসমক্ষে, পাথর দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মোহাম্মদ সোহাগ নামের এক ব্যবসায়ীকে। ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ, নির্মম, ভিডিওচিত্রসহ প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
কিন্তু এই প্রতিক্রিয়ার ধরণ ছিল কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষ সরকার কিংবা রাষ্ট্রের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা না করে, বারবার আঙুল তুলতে থাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে— যেন সেই দলই এখন বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে!
প্রশ্ন জাগে: যে দলের কর্মী অপরাধ করেছে, সেই দল কি এখন শাস্তিও দেবে? এমন কোনো আইন কি এদেশে পাস হয়েছে?
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, বিএনপিকে ঘিরে নানা কটূক্তি, আক্রমণাত্মক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও বিএনপি তাদের সংশ্লিষ্ট কর্মীকে দ্রুত বহিষ্কার করেছে এবং প্রকাশ্যভাবে দাবি জানিয়েছে— অপরাধীদের যেন আইনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
একটি রাজনৈতিক দল সর্বোচ্চ যা করতে পারে, তা হলো বহিষ্কার। এর বেশি কিছু করার সাংবিধানিক কিংবা আইনগত এখতিয়ার কোনো দলের নেই। বিচার করা, শাস্তি দেওয়া— এগুলো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সরকার ও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। তবুও জনমানসে বারবার দলকেই কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—
এই মনোভাব কি রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থার সরে যাওয়া নির্দেশ করে?
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কাউকে অপরাধ করতে উৎসাহ দেয়নি, কাউকে রক্ষা করছে না, বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে। তারপরও তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব— এমনকি তারেক রহমানকে নিয়েও কটাক্ষমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু অপরাধের দায় দল বা মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। এতে বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়, অপরাধের বিচার নয়— হয় প্রতিপক্ষ দমন।
আমরা যদি সত্যিকারের ন্যায়বিচার চাই, তাহলে অপরাধী কে, তার দল কী— সেটি মুখ্য হওয়া উচিত নয়। মুখ্য হওয়া উচিত, অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে কি না, এবং আইন তার যথাযথ প্রয়োগে সফল হয়েছে কি না।
এই ঘটনায় রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্পন্ন করা। এতে একদিকে যেমন জনআস্থা পুনরুদ্ধার হবে, অন্যদিকে অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হবে। রাজনৈতিক দলকে বিচারক বানিয়ে নয়— বরং রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল করেই আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি।