দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এর সঙ্গে বাড়ছে পোড়া রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুও। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন ভবনে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পটি আগেই নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে করোনার সময়ে সৌদি উন্নয়ন তহবিলের সঙ্গে ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, ফলে কাজ আটকে যায়।
এবার প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করে প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে ৩৬০ কোটি টাকা এবং মেয়াদ বাড়বে তিন বছর। সাড়ে তিন বছরের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এখন সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ছয় বছর। আগামী রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এ সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘৫টি নির্ধারিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন’ প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২০২ কোটি ১৬ লাখ এবং সৌদি উন্নয়ন ফান্ডের ঋণ ছিল ২৫৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এখন নতুন প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা পূর্বের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সরকারি তহবিল ৪৬৪ কোটি ৭৪ লাখ এবং বৈদেশিক ঋণ ৩৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু কাজ শুরু না হওয়ায় নতুন করে সময় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, নির্বাচিত ৫ জেলার (সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর) প্রায় ৬ কোটি মানুষকে পোড়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগের সাশ্রয়ী চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
২০১৭ সালের অক্টোবরে সরকারের সঙ্গে সৌদি উন্নয়ন ফান্ডের ঋণচুক্তি হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ২০২২ সালে প্রকল্পটি প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেও কোভিড পরিস্থিতির কারণে সময়মতো শুরু হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে বিদ্যমান আইসিইউ ভবনের ওপরে নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা ছিল। ফরিদপুরে ১০ তলা হাসপাতাল ভবনের ৬ষ্ঠ ও ৭ম তলা সংস্কার করে ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু রাজশাহীতে নির্মাণকাজের সময় আইসিইউ ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। ফলে পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিবছর দেশে প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ পোড়াজনিত দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ জনের মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের দুর্ভোগ ও মৃত্যুহার বাড়ছে। বর্তমানে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল হলেও এটি সারাদেশের বিপুল চাহিদা পূরণে অপ্রতুল।
শুধু ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ হাজার ৪১৮ জন পোড়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বরিশালে ৯৫৮ জন, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৪০৩ জন, রংপুরে ২ হাজার ৮৮৮ জন এবং ফরিদপুরে ৮ হাজার ৭০০ জন পোড়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, আলাদা বার্ন ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. কাউয়ুম আরা বেগম জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ উপকৃত হবেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর হবে, বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা কমবে এবং ঢাকার ওপর চাপ হ্রাস পাবে। তাই একনেক সভায় প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।