ঢাকা, ২১ আগস্ট ২০২৫ (বৃহস্পতিবার): একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সবল ব্যাংক হিসেবে খ্যাত বেসিক ব্যাংক এখন রীতিমতো ধ্বংসস্তূপ।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে সংঘটিত ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়ম ব্যাংকটিকে আজ “ব্যাংক খাতের বিষফোড়া”য় পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন আবদুল হাই বাচ্চু। ২০১২ সালের মধ্যেই তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাটের শিকার হয়।
ঋণের নামে বস্তায় ভরে টাকা রাতের আঁধারে ব্যাংকের শাখা থেকে বের করা হয়েছে। যোগ্যতার চেয়ে বহু গুণ বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। এর বিপরীতে নেওয়া জামানতের অধিকাংশই ছিল ভুয়া বা অতিমূল্যায়িত। ফলে ঋণ খেলাপি হয়ে যায়, আদায় সম্ভব হয়নি।
শুধু তাই নয়, এলসির নামে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এমনকি ১৭৫ কোটি টাকার এলসি খুলেও দেশে কোনো পণ্য আনা হয়নি। এসব লুট ও পাচারের ঘটনায় সরাসরি দায়ী থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বাচ্চু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।
খেলাপি ঋণ: ২০২০ সালে ৭ হাজার ৭২২ কোটি টাকা → ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা → বর্তমানে ৮ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।
কুঋণ (অপ্রত্যাশিত আদায়যোগ্য ঋণ): প্রায় ৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
প্রভিশন ঘাটতি: ৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা।
মূলধন ঘাটতি: ২০২০ সালে ৯৪২ কোটি টাকা → ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা → বর্তমানে ৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।
পুঞ্জীভূত লোকসান: ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সম্পদ: ২০২০ সালে ২০ হাজার কোটি টাকা → বর্তমানে ১৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।
আমানত: ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা → বর্তমানে ১৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
লোকসান: ২০২০ সালে ৩৭২ কোটি টাকা → বর্তমানে বছরে ৮৬৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসিক ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাংকের আয় ক্রমেই কমছে, অথচ খেলাপি ঋণ বাড়ছে। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই আটকে আছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যাদের মধ্যে অনেকেই বাচ্চুর বেনামি প্রতিষ্ঠান।
সরকার এখন পর্যন্ত ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে তা কাজে আসেনি। বরং ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটিকে বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গ্রাহকরা আতঙ্কে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা তুলে নেন। এর ফলে বেসিক ব্যাংকের সংকট আরও ঘনীভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাব আর দুর্নীতি ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। একসময়ের সবল ব্যাংক আজ ব্যাংক খাতের ‘বিষফোড়া’।