আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি ২০০৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন শুরু হয়। তবে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কোরাজন একুইনো স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এর নাম দেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রেস্টোর্ড ডেমোক্রেসি (আইসিএনআরডি)। সেখানে গণতন্ত্রকে সংহত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ) ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি’ নামে একটি ঘোষণা গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ ঘোষণা করে, আর ২০০৮ সাল থেকে এটি পালিত হতে থাকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, আজকের বিশ্বে গণতন্ত্রের ধারা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফ্রিডম হাউজের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ অব্যাহত রয়েছে। শুধু ২০২০ সালেই বিশ্বের ৭৩টি দেশে গণতন্ত্রের মান অবনতি হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের আড়ালে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন জারি রয়েছে।
বিশ্বের উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধনকুবেরদের প্রভাব বেড়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ‘বিলিয়নিয়ার বয়েজ ক্লাব’-এর উত্থান, ভারতে মোদি সরকারের আম্বানি–আদানি ঘনিষ্ঠতা কিংবা ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে ধনিকতান্ত্রিক প্রভাব তার বড় উদাহরণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন ধরণের নব্য সামন্ততন্ত্র তৈরি করছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ধনীদের স্বার্থেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
গণতন্ত্র শুধুমাত্র ভোটে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জনগণের সার্বভৌমত্ব, দায়বদ্ধতা, প্রতিনিধিত্ব ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক দেশে ক্ষমতাসীনরা গণতান্ত্রিক সরকারের নামে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা একটি টেকসই ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র। এ জন্য প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যৌথ ভূমিকা দরকার। কারণ, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে এটি কেবল শাসকগোষ্ঠীর দায় নয়, জনগণেরও দায়িত্ব।
আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়—“গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার, জনগণের কল্যাণের জন্য সরকার।”