অবশেষে নীতিসুদ কমাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। গত বছরের ডিসেম্বরের পর এই প্রথমবারের মতো সুদহার হ্রাস করা হলো। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে দুর্বলতার লক্ষণ, আফ্রো–আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়তি বেকারত্ব, কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি মন্থর হয়ে আসায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সর্বশেষ ঘোষণায় ফেড নীতি সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪% থেকে ৪.২৫%-এ নামিয়ে এনেছে। সংবাদ সম্মেলনে ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল জানান, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে সুদহার আরও কমতে পারে। তাঁর ভাষায়, শ্রমবাজারের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতাই এখন তাদের প্রধান উদ্বেগ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই সুদহার ব্যাপক হারে কমানোর দাবি জানাচ্ছিলেন। তাঁর মতে, এতে অর্থনীতি চাঙা হবে। তবে ফেডের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
ফেডের বোর্ডে নতুন গভর্নর স্টিফেন মিরান ছিলেন একমাত্র ভিন্নমতাবলম্বী। তিনি ৫০ বেসিস পয়েন্ট হারে সুদহার কমানোর পক্ষে ছিলেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় কাটছাঁটের ইঙ্গিত দেন।
জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে এবং নতুন চাকরির সংখ্যা এতটাই কম যে তা বেকারত্ব স্থিতিশীল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে সামান্য ছাঁটাইও বেকারত্বের হার বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার উপরে। এ বছরের শেষ নাগাদ তা ৩%-এ পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেখানে ফেডের লক্ষ্য হলো ২%। তবে কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেড ধীরে ধীরে ‘নিরপেক্ষ নীতি’র দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফেডের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপও তীব্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি গভর্নর লিসা কুককে সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। যদিও আদালতের লড়াইয়ে তিনি আপাতত নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প-মনোনীত গভর্নর মিশেল বোম্যান ও ক্রিস্টোফার ওয়ালার শেষ পর্যন্ত মূল সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।
ঘোষণার পর ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারের দাম প্রথমে বাড়লেও পরে ওঠানামা করে এবং দিন শেষে মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়। ডলার কিছুটা শক্তিশালী হলেও ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। বাজারে এখন প্রায় নিশ্চিত, অক্টোবর মাসেও ফেড সুদহার কমাবে।
নীতিসুদ হলো সেই হার, যেভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে রেপো রেট বলা হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, তারল্য জোগান এবং অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
কোভিড-১৯ পরবর্তী রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে ফেড একাধিকবার সুদহার বাড়িয়ে তা সর্বোচ্চ ৫.২৫% থেকে ৫.৫০% পর্যন্ত নিয়ে যায়। এবার আবার তা কমানো হলো, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন দিক নির্দেশনা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। সাধারণত সুদহার কমলে উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ বেড়ে যায়, পুরোনো উচ্চ কুপনযুক্ত বন্ড বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং ডলারের চাপ কিছুটা কমে। তাই বৈশ্বিক বাজার সব সময় ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে।