দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জনবিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় আন্দোলন ও ক্ষোভ বহুবার দেখিয়েছে—সাধারণ মানুষের রোষের সামনে শাসক শক্তির ভিত কতোটা টলমল হয়ে যায়। এবার সেই একই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে ভারতে।
দেশজুড়ে নানান ইস্যুতে জনরোষ ফেটে পড়ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভও দিনদিন জোরালো হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মণিপুরে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সাম্প্রদায়িক হিংসায় প্রাণ হারিয়েছে আড়াইশরও বেশি মানুষ। প্রায় ৬০ হাজার মানুষ এখনো উদ্বাস্তু শিবিরে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। সেখানে ফেব্রুয়ারি থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে।
বিরোধীদের অভিযোগ—মোদি সরকার ইচ্ছে করেই দুই সম্প্রদায়কে বিভক্ত করে রেখেছে। রাহুল গান্ধীর কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ, “মানুষ মরছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, আর সরকার ভোটের অঙ্ক কষছে।” প্রিয়াংকা গান্ধী প্রশ্ন তুলেছেন—প্রধানমন্ত্রী কি একদিনও সেখানে গিয়ে মানুষের চোখের জল মুছতে পারলেন না?
উত্তর-পূর্বের প্রতিবাদ এখন আসামেও ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিকপঞ্জি (NRC) ও নাগরিকত্ব আইন (CAA) নিয়ে আতঙ্কে বাংলাভাষী পরিবারগুলো। তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ভয়ে প্রতিদিন আতঙ্কিত তারা।
সম্প্রতি ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সংগঠন রাজপথে মিছিল করেছে—“আমরা ভারতীয়, আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না।” আসামে একাধিক মানবাধিকার কর্মী গ্রেপ্তার হওয়ায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে বিহারে শুরু হয়েছে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে উত্তাল আন্দোলন। বিরোধীদের অভিযোগ—এটি আসলে ভোটচুরির বৈধ প্রক্রিয়া। রাজধানী পাটনা থেকে গ্রামাঞ্চল—সর্বত্র চলছে মিছিল, অবরোধ ও অনশন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সতর্ক করে বলেছেন, “এটি গণতন্ত্র ধ্বংসের যন্ত্র।” আদালতও জানিয়ে দিয়েছে—যথাযথ সুযোগ না দিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যাবে না। এতে আন্দোলনকারীদের শক্তি আরও বেড়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি বিরোধী কণ্ঠরোধ করছে। বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে—এটি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন।
অল ইন্ডিয়া মজলিস ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) নেতা আসাদুদ্দিন ওয়েইসিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার মুসলিম, দলিত, উত্তর-পূর্ব ও বাংলাভাষী মানুষ—সবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতেও বিজেপি-বিরোধী স্লোগান তীব্র হচ্ছে। অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া বিজয় বলেছেন, “চোল ঐতিহ্যের নাটক দেখিয়ে ভোট চাইছে বিজেপি।” তার দল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—বিজেপির সঙ্গে কোনো আপস সম্ভব নয়।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৫তম জন্মদিন কেটেছে নীরবতায়। দলের ভেতরে বড় কোনো আয়োজন হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বিজেপির অভ্যন্তরীণ সংকটের ইঙ্গিত। বিরোধীদের দাবি, জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন মোদি।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—ভারত জুড়ে এখন অসন্তোষ। কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, মণিপুরের রক্তপাত, আসামের NRC আতঙ্ক, বিহারের ভোটার তালিকা বাদ পড়া—সব মিলিয়ে জনরোষ চরমে। বিরোধীরা বলছে—ভারতও দক্ষিণ এশিয়ার গণবিক্ষোভ থেকে মুক্ত নয়।
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের ডাক দিলেও বাস্তবতা বলছে উল্টো। বিরোধী শিবিরের দাবি—মোদি সরকার প্রবল চাপের মুখে, আর এই জনবিক্ষোভ দেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।