নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান খুবই কম, সেখানে এই উদ্ভাবনগুলি গ্রাহকদের আস্থা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমরা যদি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল বা দক্ষিণ এশিয়ায় বীমা খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কিছু উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করি তাহলে দেখব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্ব বীমা খাতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। অীধ এবং অষষরধহু-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এআই এবং ব্লকচেইন ব্যবহার করে দ্রুত দাবি পরিশোধ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও জালিয়াতি হ্রাসের ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অীধ-এর ব্লকচেইনভিত্তিক ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম ‘ফিজি’, গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্লাইট বিলম্বের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়। যা বীমার অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্ব বীমা খাতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনে ব্লকচেইন-ভিত্তিক স্মার্ট বীমা চুক্তিগুলি অন্তত ৪০% প্রতারণামূলক দাবি কমিয়েছে, যা শুধুমাত্র কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ই কমিয়ে দেয়নি বরং বীমা গ্রাহকদের আস্থাও তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত উদ্ভাবনের পথে এগিয়ে আছে। তাদের মোবাইল-ভিত্তিক ক্ষুদ্রবীমা পণ্যগুলি ১০০ মিলিয়নেরও বেশি নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলিতে পৌঁছেছে। ইধলধল অষষরধহু-এর মতো বীমা কোম্পানি টেলিমেটিকস-ভিত্তিক গাড়ির বীমা প্রদান করে চিত্তাকর্ষক অগ্রগতির সাক্ষী হয়েছে। এই উদ্ভাবনটি গাড়ি চালকের আচরণের উপর ভিত্তি করে বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে, যা স্বচ্ছতা এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।
ইতিমধ্যে, পাকিস্তান বীমা খাতে ব্লকচেইন প্রয়োগে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ১৫% হ্রাস পেয়েছে। এআই-ভিত্তিক দাবি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করে শ্রীলঙ্কা দাবি প্রক্রিয়াকরণের সময় ২৫% কমিয়েছে, এটি একটি মডেল যা বাংলাদেশের বীমা খাত অনুসরণ করতে পারে।
পাকিস্তানের জুবিলি ইন্স্যুরেন্স পুনর্বীমার জন্য ব্লকচেইন গ্রহণ করেছে, বীমাকারী এবং পুনর্বীমাকারীদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। এই উদ্ভাবন বিরোধ এবং প্রক্রিয়াকরণের সময় ৩০% কমিয়েছে, এটি একটি সর্বোত্তম অনুশীলন যা বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যেতে পারে, বিশেষ করে জটিল, উচ্চ-মূল্যের দাবির জন্য।
বাংলাদেশে গার্ডিয়ান লাইফ, মেটলাইফ বাংলাদেশ এবং চার্টার্ড লাইফের মতো শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি গ্রহণ শুরু করেছে। পলিসি ম্যানেজমেন্টের জন্য গার্ডিয়ান লাইফ-এর এআই-ভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ দাবি প্রক্রিয়াকরণের সময় ৩০% কমিয়েছে, অন্যদিকে মেটলাইফ বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত বীমা পলিসির জন্য ব্লকচেইনকে একীভূত করেছে। চার্টার্ড লাইফের চ্যাটবট পরিষেবা গ্রাহকের প্রতিক্রিয়ার সময় ৫০% উন্নত করেছে।
এআই, ব্লকচেইন এবং মোবাইল প্রযুক্তি বাংলাদেশে বীমা কোম্পানিগুলির কাজের ধরণে রূপান্তর ঘটাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাহক উপযোগী বীমা পণ্য তৈরি এবং দ্রুত দাবি প্রক্রিয়াকরণ করে, গ্রাহকদের সাথে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। ব্লকচেইন, একটি অপরিবর্তনীয় খতিয়ান প্রদান করে, বিরোধ দূর করতে এবং স্বচ্ছতা তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, এথিক্যাল এআই গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বীমা খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আস্থা তৈরির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। গার্ডিয়ান লাইফ এবং মেটলাইফ বাংলাদেশের মতো কোম্পানিগুলি ইতিমধ্যেই এই উদ্ভাবনগুলি গ্রহণ করছে।
শিল্পটিকে আরও আধুনিকীকরণ এবং আরও স্বচ্ছ, গ্রাহক-কেন্দ্রিক পরিবেশ তৈরি করতে এসব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এক সঙ্গে বড় পরিসরে বা অনেক বেশি খরচ না করেও ছোট ছোট আকারে কোম্পানিগুলো প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বোচ্চ স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা উচিত বলে মনে করি। ভবিষ্যতে বীমা ব্যবসাকে প্রসারিত করতে বা আরো গ্রহণযোগ্য করতে, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। কেননা নতুন প্রজন্ম চায়, তার প্রিমিয়াম জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে স্বয়ংক্রিয় বার্তা পাবে, প্রিমিয়াম দেয়ার সময় হলে বার্তা পাবে, মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তার বীমা দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে।