নাজিমের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। এটি বাংলাদেশের অনেক অভিবাসী কর্মীরই সাধারণ চিত্র, যারা উচ্চাশা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, কিন্তু শোষণ ও দুর্দশার মুখোমুখি হয়।
১. পোশাক শিল্প (RMG):
২০২৩ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি রেকর্ড ৪৭.৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০%-এর বেশি। এই খাতে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে, যাদের বেশিরভাগই নারী।
২. প্রবাসী আয়:
২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ছিল ২১.৬ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে ১১.৩৭ লক্ষ কর্মী বিদেশে গিয়েছেন—যা আগের বছরের তুলনায় ১৫% বেশি—তবুও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি স্থবির ছিল।
পোশাক শিল্প ও জনশক্তি রপ্তানির পার্থক্য
পোশাক শিল্প ও জনশক্তি রপ্তানি খাতের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য রয়েছে:
– পোশাক শিল্পের সাফল্যের কারণ:
– বাজার গবেষণা: বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ট্রেন্ড ও চাহিদা বিশ্লেষণ।
– দক্ষতা উন্নয়ন: টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
– অবকাঠামো বিনিয়োগ: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্ক গড়ে তোলা।
– ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ: “মেড ইন বাংলাদেশ” লেবেলকে বিশ্বস্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
– সরকারি সহায়তা: রপ্তানি প্রণোদনা, কর ছাড় ও বাণিজ্য নীতির সমর্থন।
– জনশক্তি রপ্তানির চ্যালেঞ্জ:
– গবেষণার অভাব: আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চাহিদা সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞান।
– দক্ষতার ঘাটতি: অনেক অভিবাসী কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা নেই।
– মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা: অনিয়ন্ত্রিত এজেন্টদের মাধ্যমে নিয়োগ, যা শোষণের দিকে নিয়ে যায়।
– বাজার কেন্দ্রীভূত: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর অত্যধিক নির্ভরতা, বৈচিত্র্যের অভাব।
– দুর্বল ব্র্যান্ডিং: বাংলাদেশি কর্মীদের বৈশ্বিকভাবে দক্ষ পেশাদার হিসেবে উপস্থাপনের উদ্যোগের অভাব।
অভিবাসী কর্মীদের আয়ের বৈষম্য
বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের আয় অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় কম:
– ফিলিপাইন: একজন ফিলিপিনো নার্স মাসে প্রায় ১,২০০ ডলার আয় করে।
– ভারত: একজন ভারতীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মাসে ২,৫০০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে।
– বাংলাদেশ: একজন বাংলাদেশি নির্মাণ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে মাসে ২০০ থেকে ৪০০ ডলার আয় করে।
মানবসম্পদ রপ্তানির কৌশলগত রোডম্যাপ
জনশক্তি রপ্তানিকে রূপান্তরিত করতে বাংলাদেশ নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করতে পারে:
১. ডিজিটাল নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম:
– একটি জাতীয় জব পোর্টাল তৈরি করা, যেখানে সরাসরি বৈধ বিদেশী নিয়োগকর্তাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করা যাবে।
– সরকারি তদারকির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগীদের উপর নির্ভরতা কমানো।
২. সম্পূর্ণ দক্ষতা উন্নয়ন:
– প্রতিটি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, যেখানে নার্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা শেখানো হবে।
– জাপানি, জার্মান ইত্যাদি ভাষার বাধ্যতামূলক কোর্স যোগ করে যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
৩. বাজার বৈচিত্র্যকরণ:
– জাপান, জার্মানি ও কানাডার মতো উদীয়মান শ্রম বাজার অন্বেষণ করা, যেখানে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে।
– দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা।
৪. বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ:
– “দক্ষ বাংলাদেশি পেশাদার” নামে একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড তৈরি করা।
– সফল প্রবাসীদের গল্প তুলে ধরে দেশের ইমেজ উন্নয়ন।
দ্রষ্টব্য: সকল আর্থিক তথ্য আনুমানিক এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে।