আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে আলোচিত আরও ১১টি ব্যাংক এবার ফরেনসিক অডিটের আওতায় আসছে। আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এই ব্যাংকগুলোর সম্পদমান যাচাই (Asset Quality Review – AQR) করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ছয়টি ব্যাংকের সম্পদমূল্য যাচাই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডেইলি স্টার-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও তিনি ব্যাংকগুলোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেননি, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকিং খাত সংস্কার বিষয়ক টাস্কফোর্সের এক বৈঠকে এই ফরেনসিক অডিটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ব্যাংক পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার ইউনিট (Bank Restructuring and Resolution Unit) ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছে। অডিট কার্যক্রমে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।
প্রত্যেকটি ব্যাংকের জন্য একজন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একইভাবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম থেকেও একজন করে নির্ধারিত কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন। এই অডিট হবে বিস্তারিত, ব্যাপক ও গভীর। শুধু আর্থিক প্রতিবেদন নয়, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতি, ঋণ প্রদানের পদ্ধতি, পুনঃতফসিলকরণ, খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি, বড় ঋণগ্রহীতাদের অবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই থাকবে ফরেনসিক বিশ্লেষণের আওতায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অডিটের আওতায় যা যা পর্যালোচনা করা হবে তার মধ্যে রয়েছে—ঋণ শ্রেণিকরণ ও পুনঃতফসিল, সম্পদের মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, একক ও বৃহৎ ঋণ নীতিমালা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, হিসাবনীতি, তারল্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা। এই পর্যালোচনার মাধ্যমে অনিয়ম, গোপন দুর্নীতি ও লুকোনো ঋণ ঝুঁকি শনাক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আমাদের ডাকা হয়েছিল, এবং আমরা প্রতিনিধি পাঠিয়েছি। তবে টাস্কফোর্সের বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না।”
এর আগে আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং (Ernst & Young) এবং কেপিএমজি (KPMG) ছয়টি ব্যাংকের সম্পদ যাচাই শেষ করেছে। এর মধ্যে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং মূল্যায়ন করেছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের। অন্যদিকে কেপিএমজি সম্পদ যাচাই করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ফেরানো এবং দুর্নীতিবাজ চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদিচ্ছাই হবে সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
ব্যাংক খাতের ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যতের অনিয়ম রোধে এই ফরেনসিক অডিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়—এই অডিটের সুপারিশ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়।