১৯৭৯ সাল। সেবার নোবেল শান্তি পুরস্কার যেন শুধু মাদার তেরেসার জন্যই নির্ধারিত ছিল। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায় তার নিরলস মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেন এই বিশ্বসেরা সম্মান। কিন্তু পুরস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি রেখে গেছেন মানবতার এক চিরন্তন শিক্ষা। মৃত্যুর পরও যেন নতুন এক দিবসের জন্ম দিলেন তিনি— আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস (International Day of Charity)।

১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন মাদার তেরেসা। রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী ও ধর্মপ্রচারক হিসেবে ১৯২৯ সালে ভারতে আসেন এবং ১৯৪৮ সালে ভারতের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। তারপর থেকেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেন অসহায়, দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষের সেবায়।
১৯৫০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Missionaries of Charity, যা কলকাতা থেকে শুরু হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৪৫ বছর ধরে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন শ্রম, মমতা ও মানবিকতা। ধনীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুদান চাইতে তার কোনো সংকোচ ছিল না। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন জাগতেই পারে—তার মৃত্যু দিবসকেই কেন আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস ঘোষণা করা হলো?
উত্তর সহজ—কারণ মাদার তেরেসার জীবনের প্রতিটি দিনই ছিল দানের জন্য উৎসর্গীকৃত। সমাজের কষ্ট লাঘব, দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো এবং ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া ছিল তার জীবনের মিশন। তাই জাতিসংঘ ২০১২ সালে তার প্রয়াণ দিবস (৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭)কে আন্তর্জাতিক দাতব্য দিবস ঘোষণা করে। ২০১৩ সাল থেকে দিবসটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে সেবামূলক কার্যক্রমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য।
আজও দারিদ্র্য পৃথিবীর বড় সংকট। কোটি মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত—খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়হীনতায় দিন কাটাচ্ছে। অথচ অন্যদিকে মাত্র এক শতাংশ ধনী দখল করছে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদ। অক্সফামের প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সাল থেকে নতুন সৃষ্ট ৪২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের ২/৩ অংশ গেছে এই ধনী শ্রেণির হাতে। অথচ বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ ভাগ করে নিয়েছে সামান্য অংশ। ধনীরা যদি মাত্র ৫% হারে কর দেয়, তবে বছরে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা দিয়ে ২ বিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব।
দান শুধু গ্রহীতার জীবনই বদলায় না, বরং দাতার জীবনেও আনে মানসিক প্রশান্তি। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Pure Altruism—অর্থাৎ প্রকৃত আত্মত্যাগ। দান দাতার মনে আনে আনন্দ, চাপ কমায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
দান শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সময়, শ্রম, জ্ঞান, এমনকি একটি ছোট সহানুভূতিও হতে পারে মহৎ দান। অন্যের মুখে হাসি ফোটানোই আসল দান।
প্রতিটি ধর্মেই দানকে মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সনাতন ধর্মে দানকে পুণ্য অর্জনের মাধ্যম বলা হয়।
ইসলামে দান, জাকাত ও ফিতরা ফরজ ইবাদত। গোপন দানকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মে দান হলো আধ্যাত্মিক সাধনার পথ, যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
মাদার তেরেসার জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের কষ্ট লাঘবই সর্বোচ্চ কর্তব্য। দান সমাজকে শুধু দরিদ্রতামুক্ত করে না, হৃদয়কে করে সমৃদ্ধ, মনকে করে প্রশান্ত। ছোট ছোট দানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন।
লেখক
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ওয়াইল্ডলাইফ বিশেষজ্ঞ