সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীদের অবস্থান বদলেছে। উনিশ শতকের রক্ষণশীল রক্তচক্ষু থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি সেক্টরে নারীরা সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ফলে সমাজ ও সভ্যতায় নারীর অবদান ক্রমশ বাড়ছে। তবে তাদের এ পথচলা কতটা মসৃণ, সেই ভাবনার অবকাশ রয়েই যায়।
দুঃখের বিষয় হলো, এই তথাকথিত আধুনিক সভ্যসমাজে নারীরা কোথাও নিরাপদ নন। এমনকি সভ্যতার চমকপ্রদ আবিষ্কার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা প্রতিনিয়ত নানাভাবে বুলিংয়ের শিকার হন। অথচ এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্বব্যাপী প্রায় সবার জীবনে নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মার্কেট প্লেস হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের বড় একটি অংশ স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখানেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আমাদের সমাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজন নারী, তিনি সেলিব্রিটি হোন কিংবা উদ্যোক্তা-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে নানা আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হন, অপমানিত, অপদস্ত হন। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই দৃষ্টিগোচর হয়। অথচ একজন ছেলের ক্ষেত্রে সচরাচর এমনটা ঘটে না!
রাস্তা, শপিংমল, পাবলিক পরিবহন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিটি জায়গায় এখনো নারীদের রীতিমতো ‘অস্তিত্বের লড়াই’ করে যেতে হচ্ছে। তবুও থেমে নেই নারীর পথচলা। ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে ‘২৪-এর জুলাই বিপ্লব- সব ক্ষেত্রেই নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। জুলাই বিপ্লবের সময় কীভাবে নারীরা সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন, তা দেখেছে গোটা বিশ্ব। কিন্তু দেখা গেছে, আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠা প্রায় প্রতিটি নারী মুখকে আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। এই সংস্কৃতি সত্যিই হতাশাজনক। ডিজিটাল বুলিংয়ের শিকার হয়ে অতীতে বহু নারী উদ্যোক্তা হারিয়ে গেছেন। অনেকে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন। কেউ-বা সারা জীবনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এমন বহু ঘটনা আছে।
এআইয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিংবা সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল মন্তব্য করে নারীদের হেনস্তা করা এখন সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে! আমাদের দেশও এ প্রবণতার বাইরে নয়। দেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নারী সুরক্ষা সম্পর্কিত কিছু আইন থাকলেও তার প্রয়োগ প্রায় শূন্যের কোটায়। নারীরা আইনের আশ্রয় নিলেও সুফল পাওয়ার হার খুবই কম। ফলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ দিন দিন ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
নারীরা এভাবে হেনস্তার শিকার হতে থাকলে সমাজ কখনোই নারীর সম্পূর্ণ কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতার সুফল ভোগ করতে পারবে না। সুতরাং, নারীসমাজের প্রতি সামাজিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের প্রতি দিতে হবে আরো সজাগ দৃষ্টি।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়