নভেম্বরেও আশানুরূপ রাজস্ব আদায় করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরে না এলে বাড়বে না রাজস্ব আদায়। দেশ পরিচালনায় খরচ মেটাতে চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে আন্দোলন, সংঘাত, ক্ষমতার পালাবদলের কারণে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মাঝেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে সরকার।
গত এক দশকে নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে হারে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। ফলে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক নিচে অবস্থান করছে। এতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারাকেও নিজস্ব সম্পদনির্ভর করা যাচ্ছে না। বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। একই সময়ে টিআইএনের সংখ্যা ছিল এক কোটি পাঁচ লাখ। আর এক দশক আগে অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। টিআইএন সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৫১ হাজার। ১০ বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, টিআইএন বেড়ে হয়েছে ছয়গুণ।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে টিআইএন ছিল ১৬ লাখ ৫১ হাজার। পাঁচ বছর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছর টিআইএন বেড়ে হয় ৪১ লাখ ১৯ হাজার। আর পরের পাঁচ বছরে টিআইএন বেড়ে এক কোটি পাঁচ লাখে পৌঁছে। রাজস্ব আদায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, টিআইএনের মতো রাজস্ব বাড়েনি। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় এক লাখ ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১৬ হাজা ৪৫১ কোটি টাকা। পরের পাঁচ বছরে বেড়ে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ রাজস্ব আদায় দাঁড়ায় তিন কোটি ৮২ লাখ ৬৭৮ হাজার টাকা। গত এক দশকে সরকারি কাজে সেবা নিতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়ে। এটিকে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল মনে করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু তারপরও রাজস্ব বাড়েনি, বাড়েনি আয়কর আদায়। ফলে, যেসব খাতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়, সেসব ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির মতে, বেশি প্রবৃদ্ধি দেখানোর কারণে মোট দেশজ উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ না থাকার কারণে এ অঞ্চলে সবচেয়ে কম রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও মোট দেশজ উৎপাদনের বড় ধরনের অসঙ্গতি সামনে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ৫০ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ২৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব আদায় হয় জিডিপির ৮ শতাংশের নিচে। এ কারণে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। বিদেশী ঋণের দ্বারস্থ হতে হয়। আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও ঋণ নিতে হয়।
বিগত সরকারগুলোর আমলে সবসময়ই রাজস্ব আদায়ের নানা উদ্যোগের কথা বা উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজস্ব আদায়ের গতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজস্ব আদায়ে নতুন সময় পুরনো সময় বলে কোনো কথা নেই। সবসময়ই রাজস্ব আদায়ের প্রত্যাশা থাকে। রাজস্ব আদায়ের বৃদ্ধি নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি এবং রাজস্ব বোর্ড প্রশাসন, অনুশাসন ও সুশাসনের ওপর। ৫ আগস্টের পর দেশ সোনার খনিতে পরিণত হয়ে গেছে, আর রাজস্ব বাড়বে, আর না বাড়লে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে, এমন নয়। চেষ্টা চলছে। রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রাজস্ব আদায়ে আগে যেমন ব্যর্থতা ও দক্ষতা ছিল, সে অবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা হচ্ছে।
নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হবেÑ এমন কোনো সুযোগ এখানে, এভাবে নেই। আর অর্থনীতি থেকে যে রাজস্ব আদায় হবে, অর্থনীতি তো সেভাবে চাঙ্গা হয়নি বা হচ্ছে না। কিংবা চাঙ্গা হওয়ার পথে রয়েছে নানা সমস্যা। তাছাড়া জুলাই-আগস্টে দুই মাস ধরে একটি আন্দোলন গেল, সেই সময় উৎপাদন প্রায় বন্ধ ছিল। এতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। সরকার পতনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে সবটাই কমে গেছে। তারপর ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে আমদানি ধীর হয়েছে। রপ্তানিও হয়েছে ধীর।
ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অর্থ খেলাপি ঋণ এবং অর্থ লুট হওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাত আর সক্ষমতার সঙ্গে কার্যক্রম চালাতে পারছে না। সরকারকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে চালাতে হচ্ছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ভালো নেই। অর্থনীতি ভালো না হলে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় করা যাবে না। রাজস্ব আদায় বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সব সময় নেওয়া হয়। ভবিষ্যতেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু রাজস্ব রাতারাতি বাড়বে, এমন বিষয় নয়। সুতরাং আগের সরকারের উদ্যোগ ভালো ছিল বা বর্তমান সরকারের সময়ে নেওয়া উদ্যোগ খারাপ হচ্ছে, এভাবে কথা বলার সুযোগ নেই।
নতুন সরকারের সময় কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো অব্যাহত আছে। এর ফলও চটজলদি পাওয়ার কোনো বিষয় নয়। এ ধরনের ভাবারও স্কোপ (সুযোগ) নেই। কারণ, চলমান অর্থনীতি থেকে রাজস্ব আসছে। চলমান অর্থনীতিতে যদি না সমস্যা থাকে, আয়-উপার্জন যদি ভালো থাকে, আমদানি-রপ্তানি যদি ভালো থাকে, তাহলে সেটি হবে। রাজস্ব আদায়ে প্রতিবার একটি উচ্চাকাক্সিক্ষত লক্ষ্য ঠিক করা হয়। আর প্রতিবছরই সেই লক্ষ্য অর্জন ব্যর্থ হয়। মাঝপথে কমিয়ে আবার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হয়।
অর্থনীতি যদি চাঙ্গা হয়, তাহলে রাজস্ব আদায় বাড়বে, অর্থনীতি যদি ভালো থাকে, তাহলে রাজস্ব বাড়বে। আর আগের সরকারের সময়ে অনুশাসন, প্রশাসন, সুশাসনের অভাবে যেসব ক্ষতি হতো, তা যদি থামানো যায়, তাহলে ধীরে ধীরে উন্নতি হবে। কাজেই রাজস্ব খাতের প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রধানত রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই বাড়ছে না রাজস্ব আদায়।
লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন