যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল এইডের (ইউএসএআইডি) অফিশিয়াল ওয়েবসাইটও এবার বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল শনিবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চেষ্টা করেও ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করা যায়নি। এমনকি ইউএসএআইডির এক্স অ্যাকাউন্টও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নির্বাহী আদেশে বৈদেশিক সহায়তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই এই বিষয়টি সামনে এল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। শনিবার ওয়েবসাইটটি অ্যাকসেসের চেষ্টা করা হলেও ‘সার্ভারের আইপি ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি’—এমন একটি বার্তা প্রদর্শিত হয়। এক্সে ইউএসএআইডির অ্যাকাউন্ট খুঁজতে গেলে দেখাচ্ছে ‘এই অ্যাকাউন্টটি এখন আর নেই।’
গত শুক্রবার রয়টার্সকে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডি-এর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে এটিকে পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে আনার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তার জন্য যে ৪২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিত তা আপাতত স্থগিত করে সরাসরি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে নেওয়া হবে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে গত শুক্রবার ইউএসএআইডির সব সিলমোহরও এর কার্যালয় থেকে অপসারণ করা হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি মূলত এই সংস্থাটিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার ইঙ্গিত।
বাংলাদেশেও সব মার্কিন সহায়তা বন্ধ, জানিয়ে দিল ইউএসএআইডিবাংলাদেশেও সব মার্কিন সহায়তা বন্ধ, জানিয়ে দিল ইউএসএআইডি
এর আগে, ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি সহায়তা বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। গত সপ্তাহে প্রশাসন জানিয়েছিল, বৈশ্বিক সহায়তা কার্যক্রম ট্রাম্পের ‘আমেরিকা সবার আগে’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা পর্যালোচনার জন্য তারা বিদেশি সাহায্য সাময়িকভাবে স্থগিত রাখছে।
তবে এই বিষয়ে ইউএসএআইডির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা বলেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মতভিন্নতার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংস্থাটিকে পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে আনা হলে এটি হবে এক ‘বিপর্যয়কর পরিবর্তন’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এর ফলে মার্কিন সরকার এমন এক অবস্থানে চলে যাবে, যেখানে মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত কণ্ঠস্বর উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্ব পাবে না।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পশ্চিম গোলার্ধে নতুন মার্কিন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা তুলে ধরেন। রুবিও বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে তাঁর প্রথম সফরে এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, কোস্টারিকা, পানামা ও ডোমিনিকান রিপাবলিকে যাবেন।
রুবিও বলেন, ‘আগের প্রশাসনগুলো এই দেশগুলোকে উপেক্ষা করেছে। তারা বৈশ্বিক ইস্যুগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং এমন নীতি অনুসরণ করেছে যা চীনের অর্থনৈতিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে এবং এমনটা করতে গিয়ে প্রায়ই আমাদের প্রতিবেশীদের ক্ষতি হয়েছে।’
রয়টার্স জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস এমন এক আইনি উপায় খুঁজছে যার মাধ্যমে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ জারি করে সংস্থাটির স্বাধীনতা বাতিল করতে পারেন। সম্ভব হলে তিনি দুই-একদিনের মধ্যেই এ ধরনের নির্দেশে স্বাক্ষর করতে পারেন। তবে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ইউএসএআইডিকে পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে আনতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গরিব দেশে এইচআইভি–যক্ষ্মাসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সহায়তা বন্ধ করলেন ট্রাম্পগরিব দেশে এইচআইভি–যক্ষ্মাসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সহায়তা বন্ধ করলেন ট্রাম্প
সংস্থাটি যদি পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে চলে যায়, তাহলে এটি আগের চেয়ে আরও স্পষ্টভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আগে যেখানে এটি স্বাধীনভাবে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করত, এমনটা হলে তা আর ঘটবে না।
সংস্থাটি অতীতে এমন দেশগুলোকেও সহায়তা করেছে যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, যেমন ইরান। সংস্থাটির এক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকার কারণে ইউএসএআইডি এমন সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে। প্রকৃতপক্ষে, স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে সম্ভব হতো না।
অবশ্য, পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনার ইঙ্গিত হিসেবে, ট্রাম্প এখনো সংস্থাটি পরিচালনার জন্য কাউকে মনোনীত করেননি। তবে মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা স্থগিত রাখার ফলে ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। থাইল্যান্ডের শরণার্থীশিবিরে ফিল্ড হাসপাতাল, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্থল মাইন অপসারণ এবং এইচআইভি আক্রান্ত লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসার মতো কার্যক্রম অর্থসংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।
এর আগে, ২০২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ৭২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রদান করেছে। যার মধ্যে যুদ্ধ প্রবণ অঞ্চলে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পানির সরবরাহ, এইচআইভি/এইডস চিকিৎসা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের ট্র্যাককৃত সমস্ত মানবিক সহায়তার মধ্যে ৪২ শতাংশ ছিল মার্কিন অনুদান।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের পর গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র দপ্তর বিশ্বব্যাপী ‘কাজ বন্ধের’ নির্দেশ জারি করে। যার ফলে কার্যত সব বৈদেশিক সহায়তা স্থগিত হয়ে যায়, কেবল জরুরি খাদ্য সহায়তাকে এর বাইরে রাখা হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই পদক্ষেপ মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে।
এই সপ্তাহের শুরুতে রুবিও আরও একটি ছাড়পত্র অনুমোদন করেছেন। এই ছাড়পত্র ‘জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা’ অব্যাহত রাখার সুযোগ দেবে। তবে এটি চলবে আপাতত ৯০ দিন। কারণ, এই সময়ের মধ্যে হোয়াইট হাউস ইউএসএআইডির কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে।